গারো পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত শেরপুর ময়মনসিংহ বিভাগের
অন্তর্গত একটি জেলা। ময়মনসিংহ বিভাগ ঘোষিত হওয়ার আগে শেরপুর ঢাকা বিভাগের
অন্তর্ভুক্ত ছিল। শেরপুরের উত্তরে ভারতের মেঘালয় রাজ্য। দক্ষিণ ও পশ্চিমে জামালপুর
জেলা এবং পূর্বে ময়মনসিংহ জেলা। শেরপুর জেলার আয়তন ১৩৬৪ বর্গ কিলোমিটার এবং
জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ১০০০ জন। শেরপুর জেলা পাঁচটি উপজেলা নিয়ে
গঠিত। এগুলো হল শেরপুর সদর, নকলা, ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ী এবং শ্রীবরদী। পুরানো ব্রহ্মপুত্র এ জেলার
একমাত্র নদ। অন্যান্য নদীর মধ্যে কংশ, ভোগাই,
মহারাশি, মিরগী, ঝিনাই এবং দুধদা অন্যতম।
ইতিহাস ঐতিহ্য
শেরপুর অঞ্চল প্রাচীনকালে কামরুপা রাজ্যের অংশ ছিল। মোঘল
সম্রাট আকবরের শাসনামলে এ অঞ্চল দশকাহনিয়া নামে পরিচিতি লাভ করে। ঐ সময় শেরপুর এলাকায়
যেতে হলে ব্রহ্মপুত্র নদ পারি দিয়ে যেতে হত। খেয়া নৌকাই ছিল ব্রহ্মপুত্র পারি
দেয়ার একমাত্র মাধ্যম। খেয়ার পারি দেয়ার জন্য দশকহন কড়ি নির্ধারিত ছিল বলে এ
এলাকার নাম সময়ের সাথে সাথে দশকহনিয়া হয়ে গিয়েছিল। সতের শতকের দিকে ভাওয়ালের গাজী
ইসা খানের বংশধররা দশকহনিয়া এলাকা দখল করে নেয়। গাজী বংশের শেষ জমদার শের আলী
গাজীর নামানুসারেই ঐ এলাকার নামকরন করা হয়েছিল শেরপুর।
বহু পূর্ব থেকেই শেরপুর এলাকার জনগন ছিল বেশ সংগ্রামী।
বৃটিশদের বিরুদ্ধে ফকির আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র ছিল শেরপুর এলাকা। ফকির
আন্দোলনের অন্যতম নেতা টিপু শাহ এ অঞ্চলে সার্বভৌমত্ব ঘোষনা করে নিজস্ব রাজধানীও
প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
১৯৮৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারী স্বতন্ত্র জেলা হিসাবে আত্মপ্রকাশ
করার আগে জেলাটি জামালপুর জেলার একটু মহকুমা ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় শেরপুর ১১ নং
সেক্টরের আওতায় ছিল। ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর শেরপুর জেলা শত্রুমুক্ত হয়। শেরপুর
জেলার উত্তর সীমান্তে গারো পাহাড়ের পার্শ্ববর্তী সমতল এলাকায় শত শত বছর ধরে বেশ
কিছু উপজাতি এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বসবাস করে আসছে যাদের মধ্যে গারো, কোচ, হাজং প্রভৃতি অন্যতম। এরা তাদের নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষায় কথা
বলে।
দর্শনীয় স্থান
শেরপুরের দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম হল রাজার পাহাড়।
শেরপুর সদর থেকে প্রায় ৩৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত শ্রবরদী উপজেলার কর্নঝোরা বাজার
এলাকায় রাজার পাহাড় অবস্থিত। রাজার পাহাড় নিয়ে অনেক কাহিনী লোকমুখে প্রচলিত থাকলেও
হয়ত অতীতে কোন প্রতাপশালী রাজার স্মৃতি ধারন করেছে বলেই এর নাম রাজার পাহাড়। জেলার
অন্যান্য দর্শনীয় স্থানের মধ্যে রয়েছে গজনী অবকাশ কেন্দ্র, মধুটিলা ইকোপার্ক, কলা বাগান, গড়জরিপা বার দুয়ারী মসজিদ, আড়াই আনি জমিদার বাড়ি, নয়াবাড়ির টিলা, পৌনে তিন আনি
জমিদার বাড়ি, মুন্সি দাদার মাজার
প্রভৃতি। শেরপুরের ছানার পায়েস এবং
ছানার চপ অনেক বেশি জনপ্রিয় খাবার।
যাতায়াত
ঢাকা থেকে শেরপুরের দূরত্ব
১৯৮ কিলোমিটার। ঢাকা থেকে সরাসরি শেরপুরের কোন ট্রেন নেই। তবে জামালপুরগামী যেকোন
ট্রেনে জামালপুর পর্যন্ত গিয়ে সেখান থেকে সিএনজি বা ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সায় খুব
সহজে শেরপুর যাওয়া যায়। সড়কপথে যেতে চাইলে ঢাকার মহাখালী কাউন্টার থেকে সরাসরি
শেরপুরগামী অনেক বাস পাওয়া যায়। তবে অধিকাংশই বাসই যাত্রাপথে প্রচুর থামে এবং
যাত্রী ওঠানামা করায় যা একটু যন্ত্রনাদায়ক। অবশ্য ননস্টপ এসি কিংবা নন এসি বাসও
রয়েছে। শেরপুরে থাকার জন্য
মোটামোটি সাধ্যের মধ্যে বেশকিছু হোটেল রয়েছে। এখানের লোকাল রেস্টুরেন্টগুলোর খাবার
খুবই সুস্বাদু।

0 Comments