বান্দরবন জেলা
বাংলাদেশের সৌন্দর্য
আর বৈচিত্র্যের একটি বিরাট অংশ ধারন করে আছে যে তিনটি পার্বত্য জেলা তার একটিই বান্দরবন। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে কম জনবসতিপূর্ন এলাকা। দেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত এ জেলাটি চট্টগ্রাম বিভাগের
অন্তর্গত। বান্দরবন জেলার
আয়তন ৪৪৭৯ বর্গ কিলোমিটার এবং ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী জেলার প্রতি বর্গ
কিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব ৮২ জন। ঢাকা থেকে বান্দরবনের দূরত্ব ৩১৫ কিলোমিটার এবং
চট্টগ্রাম থেকে ৭৫ কিলোমিটার। বান্দরবন জেলার উত্তরে রাঙ্গামাটি জেলা, দক্ষিণে
মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশ, পূর্বে রাঙ্গামাটি জেলা ও মায়ানমারের চিন প্রদেশ এবং
পশ্চিমে চট্টগ্রাম জেলা, কক্সবাজার জেলা ও মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশ। বৃহদাকৃতির এ
জেলাটি সাতটি উপজেলা নিয়ে গঠিত। এগুলো হল বান্দরবন সদর, থানচি, নাইক্ষাংছড়ি,
আলীকদম, রুমা, রোয়াংছড়ি এবং লামা। বাংলাদেশের একমাত্র নদী সাঙ্গু যা দক্ষিণ থেকে
উত্তরে প্রবাহিত। এ সাঙ্গু নদী বান্দরবন জেলায় অবস্থিত।
ইতিহাস ঐতিহ্য
পার্বত্য অঞ্চল হয়ার
কারনে এ অঞ্চলের লোকদের কৃষ্টি কালচার ছিল অন্যসব অঞ্চলের চেয়ে আলাদা। প্রাচীনকালে
বিভিন্ন সময় এ অঞ্চল আরকান রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে এসব পাহাড়ি এলাকার পরিবেশ এবং রাস্তাঘাট সমতলের থেকে আলাদা
হওয়ায় বেশিরভাগ সময়ই সমতলের সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হত এ এলাকার মানুষজন। এমনকি পাহাড়ে এখন পর্যন্ত এমন কিছু এলাকা রয়েছে যেখানের বাসিন্দারা
আজও বিদ্যুৎ সেবা থেকে বঞ্চিত। প্রাথমিক শিক্ষা
গ্রহনের জন্যও তাদের পাহাড়ি রাস্তার প্রায় ৫-৭ কিলোমিটার পারি
দিতে হয়।
১৫৫০ সালের যে খসরা মানচিত্র
পাওয়া যায় তাতেও বান্দরবন জেলার অস্তিত্ব বিদ্যমান ছিল। বিভিন্ন সময়ে আরকান রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত থাকলেও এ অঞ্চলের পাহাড়িদের
সাথে অন্য অঞ্চলের রাজারা খুব সহজে পেরে উঠত না। তাই বেশিরভাগ সময়ই বিভিন্ন পাহাড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর গোত্রীয়
শাসনই পরিচালিত হয়েছে এ এলাকায়। ১৭৬০ সালে বৃটিশ
ইস্ট ইন্টিয়া কোম্পানি এ অঞ্চল নিজেদের অধীনে নেয় এবং তারা এ অঞ্চলের নামকরন করে চিটাগাং
হিল টেক্স বা পার্বত্য চট্টগ্রাম। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের
পর পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অধীনে নেয়া হয়। ১৯৫১ সালে পাকিস্তান সরকার বান্দরবনকে রাঙ্গামাটি জেলার অধীনে
একটি মহকুমা হিসাবে পুনর্গঠিত করে। স্বাধীনতার পর ১৯৮১
সালের ১৮ এপ্রিল সাতটি উপজেলার সমন্ময়ে স্বতন্ত্র জেলা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে বান্দরবন
জেলা।
বান্দরবন জেলার নামকরন
নিয়ে একটি গল্পমিশ্রিত ইতিহাস প্রচলিত আছে। স্থানীয় রূপকথা অনুযায়ী, এককালে
এ অঞ্চলে প্রচুর বানর বাস করত। বানরগুলো পাহাড়ি
ঝিরিতে লবন খেতে আসত। বৃষ্টির কারনে যখন
এখানের ঝিরিগুলোর পানি বৃদ্ধি পেত তখন বানরগুলো একটি অন্যটির পা ধরে অসাধারণ উপারে
ঝিরিগুলো পারি দিতে। ঐ ঘটনার মাধ্যমেই
কালক্রমে এ অঞ্চলের নামকরন হয় বান্দরবন।
দর্শনীয় স্থান
পার্বত্য জেলাগুলোর পরতে
পরতে লুকিয়ে আছে অসাধারণ এক সৌন্দর্যের হাতছানি। পাহাড় আর ঝর্নায় পরিপূর্ন বান্দরবন জেলাও নৈসার্গিক সৌন্দর্যের
অপরূপ এক লীলাভূমি। সত্যি বলতে, বাংলাদেশের
পাহাড়ের সৌন্দর্য একবার যে প্রত্যক্ষ না করেছে সে কখনই বুঝবে না যে এ জেলাগুলো কত সুন্দর। বান্দরবন জেলার বিখ্যাত দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম হল- নীগগিরি, নীলাচল, কেওকারাডং, বগালেক, নাফাথুম, চিম্বুক
পাহাড়, ডিম পাহাড়, শৈলপ্রপাত ঝর্না, চিংড়ি ঝর্না, নীল
নীল দিগন্ত ইত্যাদি। বগালেক হয়ে কেওকারাডং
এর চুড়ায় ট্রাকিং করে যাওয়া অনেক কষ্টসাধ্য। কিন্তু আপনার যদি প্রবল ইচ্ছা থাকে তাহলে ঘুরে আসতে পারেন কেওকারাডং
এর চুড়া। দেখানকার অপরূপ
সৌন্দর্য মুহূর্তের জন্য আপনাকে ভুলিয়ে দেবে যে আপনি পৃথিবীতে আছেন। কেওকারাডং এর চুড়ায় দার্জিলিং পাড়া নামে একটি অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন
গ্রাম আছে যার অধিবাসীরা গ্রাম নোংরা হওয়ার ভয়ে একটি গবাদি পশুও পালন করে না। তবে, সকলের প্রতি অনুরোধ থাকবে, পাহাড়ে
ঘুরতে গিয়ে যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নোংরা করবেন না। বিশেষ করে প্লাস্টিক এবং পলিথিনের দ্রব্যাদি পাহাড়ে যেখানে সেখানে
না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলবেন।
বান্দরবনে পাহাড়ে ঘুরতে
গেলে সেনাবাহিনী কর্তিক নির্ধারিত উপায়ে রেজিস্টার্ড গাইড সাথে নেয়া বাধ্যতামূলক। তাছাড়া, ভুলেও আর্মি কযাম্পের আশেপাশের স্থানে ছবি তুলবেন না বা ড্রোন
ওড়াবেন না।
যাতায়াত
ঢাকা থেকে বান্দরবন যাওয়ার
যাওয়ার একমাত্র উপায় হল সড়ক পথ। ঢাকার সায়েদাবাদ, মহাখালী, গাবতলী
এবং কমলাপুর রেকিওয়ে স্টেশনের উল্টো দিক থেকে
বেশ কিছু এসি এবং নন এসি বাস বান্দরবনের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। আর বান্দরবনে যাওয়ার পর পাহাড়ি রাস্তায় ভ্রমনের একমাত্র বাহন
হল চাঁদের গাড়ি এবং জীপ। সাধারনত আপনার গাইডই
আপনাকে গাড়ির ব্যবস্থা করে দেবে। তবে এসব স্থানে
ভ্রমনে গেলে যত বড় গ্রুপ তত বেশি সাশ্রয়।

0 Comments